মতামত

তৈরি থাকুন অমানবিক চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য

প্রতারিত সাংবাদিকওয়ারেছুন্নবী খন্দকার : ১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীর সমুদ্র যাত্রা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ খুলে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় মানুষ বাণিজ্যিক ব্যবস্থা হতে আধুনিক শিল্পায়নের দিকে ঝুঁকে পড়ায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে। সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব সংগঠিত হয় | ইংল্যান্ডের ইতিহাসে ১৭৫০ এর দশকে কৃষি এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থার পরিবর্তে আধুনিক শিল্পায়ন শুরু হয়। আমেরিকায় প্রথম শিল্প বিপ্লব সংঘঠিত হয় ১৭৬০ এর দশকে। এরপর ১৭৮৪ সালে বাস্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কারের পর তুমুল গতি পায় প্রথম শিল্প বিপ্লব। দ্বিতীয় শিল্প-বিপ্লবের সূচনা ঘটে ১৮৭০ এর দশকে বিদ্যুৎ আবিস্কারের মাধ্যমে। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪) পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম শিল্প বিপ্লবের ধারাবাহিকতার মধ্যে থেকে আরো বিস্তারিত রূপে বিপ্লবের গতি বাড়িয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায় ওই সময়। রেলপথ নির্মাণ এবং বড় আকারের ইস্পাত ও লোহার ব্যবহার দেখা যায়। ওই সময় বিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যোগাযোগ ছিল প্রধান বিষয়বস্তু। জার্মানী ও যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া পেট্রোলিয়াম, কাগজ তৈরি মেশিন, অটোমোবাইল, সামুদ্রিক প্রযুক্তি, রাসায়নিক ব্যবহার ইত্যাদিও ব্যাপকভাবে উন্নত করা হয়েছিল ওই সময়কালে। তৃতীয় শিল্প-বিপ্লব শুরু হয় মূলত ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিস্কারের মাধ্যমে। যোগাযোগ প্রযুক্তি পাল্টে দেয় বিশ্ব। যার ফলাফল আমরা এখন ভোগ করছি।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব তবে কী?

এইতো কয়েক বছর আগেও ছবি তুলতে গেলে কোড্যাক ফিল্ম চাই চাই-ই। লাইট সেনসিটিভি অনেক উন্নত হওয়ায় এ ফিল্মের চাহিদা ছিল বিশ্বব্যাপী। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে কোড্যাক কোম্পানিতে দেড় লাখেরও বেশি কর্মচারী কাজ করতেন। কিন্তু এখন? ডিজিট্যাল ক্যামেরায় একটিমাত্র ম্যামোরি কার্ডে লাখ লাখ ছবি জমা রাখা যায়। সহজে ছবি সম্পাদনা ও স্থানান্তর করা যায়। একটি ছবি ভালো না হলে আরেকটি তুলতে কোনো ব্যয় করতে হয় না। মার খায় কোড্যাকের ব্যবসা। কোড্যাক এখন ইতিহাস।

কোড্যাকের মতো আরো অনেক কোম্পানিকে মাথানত করতে হয়েছে তথপ্রযুক্তির দাপটের কাছে। যেমন- HMT (ঘড়ি), DYANORA (TV), MURPHY (radio) ইত্যাদি। অথচ এই কোম্পানিগুলো এক নামে পরিচিত ছিল এক সময়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে সেগুলো এখন ইতিহাস।

এখনও হয়ত আমরা অনেকে ভাবতেও পারছি না আর ১০ বছর পর কি ঘটতে যাচ্ছে। ভাবতে আরো কষ্ট হতে পারে আজ থেকে ১০ বছর পর হয়ত ৭০-৯০ শতাংশ চাকুরিই বিলুপ্ত হতে পারে। তাহলে কি আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের খুব কাছাকাছি?

শহরে এসেছে উবার নামক রাইডিং সেবা। যাদের কোনো গাড়ি নেই। একটি সফটওয়্যার। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না।

Airbnb-র নাম হয়ত অনেকে শুনেছেন। তাদের নিজস্ব কোনো হোটেল নেই। অথচ তারা বিশ্বব্যাপী আবাসিক হোটেল সেবা দিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে Paytm, ওলা ক্যাব, Oyo rooms ইত্যাদি অসংখ্য কোম্পানির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে আমেরিকায় নতুন আইনজীবীদের কাজ নেই বললেই চলে। কারণ, IBM Watson নামে একটি আইনি software যে কোনো নতুন আইনজীবীর তুলনায় ভালো ওকালতি করতে পারে। তার মানে আর ১০ বছর পর প্রায় ৯০ শতাংশ আমেরিকানদের আর কোনো চাকরি থাকবে না হয়ত। টিকে থাকবেন বাকি ১০ শতাংশ বিশেষজ্ঞ।

চিকিৎসকদেরও চাকরি নিয়ে টানাটানিতে পড়তে হবে। Watson নামের একটি software মানুষের থেকেও চার গুণ নিখুঁতভাবে ক্যানসার এবং অন্যান্য রোগ শনাক্ত করতে পারে।

আগামী বছরই রাস্তায় নামতে চলেছে চালকহীন গাড়ি। এর ফলে ১০ বছর পর আজকের ৯০ শতাংশ গাড়িই আর রাস্তায় দেখা যাবে না। এগুলোকে হয় নষ্ট করে ফেলতে হবে না হয় হাইব্রিড বানাতে হবে। রাস্তাগুলো ক্রমশঃ ফাঁকা হতে থাকবে। পেট্রোলের ব্যবহার কমবে এবং পেট্রোল উৎপাদনকারী আরব দেশগুলি ক্রমশ দেউলিয়া হয়ে আসবে।

তখন গাড়ি লাগলে, উবারের মত কোনো software-এর কাছেই গাড়ি চাইতে হবে। আর গাড়ি চাইবার কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ চালকবিহীন একটা গাড়ি আপনার দরজার সামনে এসে দাঁড়াবে। আপনি যদি অনেকের সাথে ওই একই গাড়িতে যাত্রা করেন, তাহলে মাথাপিছু গাড়িভাড়া বাইকের থেকেও কম হবে।

গাড়িগুলো চালকবিহীন হলে ৯৯ শতাংশ দুর্ঘটনা কমে যাবে। এবং সে কারণেই গাড়ি-বিমা বন্ধ হবে এবং গাড়ি-বিমার কোম্পানিগুলোকে অস্বিত্ব নিয়ে টানাটানিতে পড়তে হবে। রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশেরও তেমন দরকার হবে না।

আপনারা কি ভাবতে পাচ্ছেন আজ থেকে কয়েক বছর আগেও রাস্তার মোড়ে মোড়ে ফোন (STD) বুধ ছিল। দেশে মোবাইল ফোন আসার পর সবগুলো বন্ধ হয়ে গেল। যেগুলো টিকে রইল, সেগুলো মোবাইল রিচার্জের দোকান হয়ে গেল। এরপর মোবাইল রিচার্জেও অনলাইন বিপ্লব এল। ঘরে বসেই অনলাইনে মোবাইল রিচার্জ শুরু হলো। এই রিচার্জের দোকানগুলোকে তখন আবার বদল আনতে হল। এরা এখন কেবল মোবাইল ফোন কেনা-বেচা এবং সারাইয়ের দোকান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সেটাও বদলাবে খুব শিগগিরই। Amazon, Flipkart থেকে সরাসরি মোবাইল ফোন বিক্রি বাড়ছে। দেশেও চলছে অনলাইন শপ। পণ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বাসায়।

টাকার সংজ্ঞাও পাল্টাচ্ছে। একসময়ের নগদ টাকা আজকের যুগে “প্লাস্টিক টাকায়” পরিণত হয়েছে। ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ডের যুগ ছিল কদিন আগেও। এখন সেটাও বদলে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে মোবাইল ওয়ালেট-এর যুগ।

কাগজে গণমাধ্যমের দিন শেষ হয়ে আসছে বিশ্বব্যাপী। আজকের খবর পরের দিন কাগজের পরার জন্য হয়ত আর কেউ অপেক্ষা করে থাকবেন না। কিংবা টিভিতে নির্ধারিত সময়ের খবর দেখার অপেক্ষা করবে না কেউ।

কয়েক বছর আগেও কোনো নতুন শিল্পীর গান বেরুলে ক্যাসেট কেনার জন্য দোকানে দোকানে যেতে হতো। সব দোকানে আবার সব ক্যাসেট পাওয়াও যেত না। এরপর আসল সিডি। এখন সেটাও মার খাচ্ছে। কেউ প্রযোজনা কোম্পানির কাছেও যাচ্ছে না এখন। গান বের করে ইউটিউবে আপলোড করে উপার্জন করছে।

তৈরি থাকুন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের গতি আরো দ্রুত এবং অমানবিক হতে পারে।

ট্যাগ
Close
Close