মতামত

সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলতেই থাকবে?

সড়কে মৃত্যুর মিছিল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজের বাসে ঢাকা আসছিল। রাত সাড়ে চারটায় গজারিয়ায় বাসটি যানজটে পড়লে তাঁদের একজন সাইদুর রহমান পায়েল প্রক্ষালন করার কথা বলে বাস থেকে নেমে যান। এ সময় তার বন্ধু বাসটিতে ঘুমাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে যানজট ছুটে গেলে বাসটি তাঁকে না নিয়েই ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পরে ভবের চরের নদীতে তার লাশ পাওয়া যায়। তখন ধারণা করা হয়েছিল, পায়েলকে একা পেয়ে হয়তো দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করেছে।

পায়েলের বন্ধুকে এই গল্পই বলেছিল বাসের চালক, সহকারী ও সুপারভাইজার। পকেটে থাকা মানিব্যাগে রাখা টেলিফোন নম্বর থেকে পায়েলের পরিচয় জানা যায়। পরবর্তীকালে তদন্তে যে তথ্য বেরিয়ে আসে, তা ভয়ংকর। বাসটি ছেড়ে দিলে পায়েল দৌড়ে উঠতে গিয়ে মারাত্মক আঘাত পায়। তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বাসের তিন কর্মচারী আহত পায়েলকে বাসে না তুলে পাশের সেতু থেকে নিচে ফেলে দেয় এবং পরদিন তার লাশ ভেসে ওঠে। সেতু থেকে নিচে ফেলে দেয়ার আগে বাসের হেল্পার তার মৃত্য নিশ্চিত করতে পায়েলের মুখ থেতলে দেয়।

চারদিকে সবাই কথা বলছে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে। অনেকেই বলছে কিভাবে পারে মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে? কিন্তু আমি অবাক হইনি। আমি অনেকদিন ধরেই এমন দেখছি এই পরিবহন শ্রমিকদের। নিষ্ঠুরতাই তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে এবং তারা জানে যে, তাদের রক্ষার জন্য ক্ষমতার কেন্দ্র শক্তিশালী চক্র আছে। এবং আমি বুঝতে পারছি বাংলাদেশর পরিবহন শ্রমিকদের সাত খুন মাফ হতেই থাকবে। এর আগে ঈদের সময় দেখেছি, এক গাড়ির চালক যাত্রাবাড়িতে ইচ্ছে করে গাড়ি তুলে দিয়েছে আরেক প্রাইভেট গাড়ির চালকের ওপর।

এই ঘটনা নিয়ে যখন লিখছি, তখনই খবর এলো, রাজধানীর রেডিসন হোটেলের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা তিন শিক্ষার্থীকে চাপা দিয়ে মেরেছে এক বাস। এরা তিনজনই শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী। দুপুর ১টার দিকে উত্তরাগামী জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস মিরপুর ফ্লাইওভার থেকে নেমে অন্য আরেকটি বাসের সাথে পাল্লা দিলে কুর্মিটোলা এমন দুর্ঘটনা ঘটে।

সাংবাদিক হিসেবে প্রতিদিনই সড়কে মানুষের মৃত্যুর থবর লিখতে লিখতে আমাদের আর কোন অনুভূতি যেন কাজ করেনা। এসব আসলেই এখন আর এমন কিছুই নয়। যারা পরিবহন ব্যবসা করেন, যারা এর শ্রমিক তাদের কাছে এসব মৃত্যূ কিছুই নয়। কিন্তু তাদের অনভূতিকে আরও ভোতা করছে, তাদের প্রশ্রয় দেয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

সেখানেই সমস্যা। দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতি বছরই নানা অনুষ্ঠান ঘটা করে পালিত হয়। কিন্তু দুর্ঘটনা এড়ানো কোনও ভাবেই সম্ভব হচ্ছেনা। বাংলাদেশে দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু গণহত্যায় পরিণত হয়েছে। পথকে সুরক্ষিত করতে, জীবনকে নিরাপদ রাখতে সরকারের দিক থেকে কোন উদ্যোগই দেখা যাচ্ছেনা। ট্রাফিক সপ্তাহসহ যেসব আনুষ্ঠানিকতা আছে, সেসব শুধু প্রচারেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, কমানো যায়নি দুর্ঘটনা। যেভাবে দেশ জুড়ে বেপরোয়া গাড়ির দাপাদাপি চলছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন হলেও সরকারের নীতি নির্ধারনী স্তরের কেউই বিচলিত নয়। বরং ক্ষমতাসীন অনেকের দিক থেকেই পরিবহন মালিক শ্রমিকদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশিত।

একটা সময় ছিল রাজধানী ঢাকায় দুর্ঘটনা কম হতো। এখন এই স্থবির শহরেরও পথে পথে খুন। তাড়াহুড়ো করে গাড়ি চালাতে গিয়ে পথচলতি মানুষকে পিষে দিয়ে যাচ্ছে, কখনও রেষারেষি করতে গিয়ে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে— প্রতি দিনের এই ছবিটি বদলের জন্য কোন ব্যবস্থা কি আছে? পরিসংখ্যান আর উচ্চারিত না হোক। তবে এটুকু বলতে পারি বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনার তালিকায় বেশ উপরের দিকে রয়েছে বাংলাদেশ।
রাষ্ট্র আইন প্রণয়নের কথা ভাবছেনা, শ্রমিকদের কোন নির্দেশনা দিচ্ছেনা। নির্বিকারভাবে প্রতিদিনের নিষ্ঠুরতা দেখছে। পায়েলের ঘটনার পরও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে মন্ত্রী বা পরিবহন মালিক, শ্রমিক নেতাদের (যারা আবার নিজেরাও মন্ত্রী) কোন উদ্বেগ দেখা যায়নি।

সরকারে নানাস্তর থেকে ভিকটিম পথচারীদের যেভাবে দোষারোপ করা হয়, তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। অনেকেই হেলমেট ছাড়া গাড়ি চালাচ্ছেন, যা খুবই আশংকাজনক। সাধারণ পথচারীরা সতর্কভাবে রাস্তা পার হননা, ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করেননা, এসবই সত্য। মানুষকে সচতেন হতেই হবে। কিন্তু রাষ্ট্র কি একটা বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারেনা যে, বেপরোয়া গাড়ি চালালে আইনি ব্যবস্থা থেকে ছাড় পাওয়া যাবেনা? পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা কি একটা সংস্কৃতি তাদের বাহিনীর মাঝে আনতে পারেননা যে, আইন ভাঙ্গলে বিচার মানতেই হবে?

এই দুটি জায়গা নিশ্চিত করতে পারলে, নিশ্চয়ই অন্য জায়গাগুলোতো শৃংখলা ফিরবে। পরিবহন খাতের লোকজন বলেন, বেহাল সড়ক, রাস্তায় বেআইনি যানবাহন, পার্কি সংকট, যত্রতত্র হকার, রাস্তায় নির্মান সামগ্রী ফেলে রাখা দুর্ঘটনার কারণ। আমরা স্বীকার করি এবং এসব সমস্যার সমাধান চাই। কিন্তু তাদের হৃদয়ের পরিবর্তনতো নিজেদেরই করতে হবে। যদি, তারা না চান, যদি রাষ্ট্র না চায়, যদি নীতি নির্ধারকরা সাধারণকে মানুষই মনে না করেন, তবে চলতেই থাকুক সড়কে মৃত্যুর মিছিল।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, এডিটর ইন চিফ, সারাবাংলা.নেট, দৈনিক সারাবাংলা ও জিটিভি

সংবাদ উৎস
সারাবাংলা
ট্যাগ
Close
Close