ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকেভ্রমণ

আয়েশী ঢাকাবাসীর চোখে কলকাতার পরিবহন

কলকাতার পথে পথে - ৭

hur collection
শাকিল হোসাইন

শাকিল হোসাইন: আজ পরিবহন নিয়ে কিছু বলি। অনেকে হয়তো পঞ্চাশ বা শতবার গিয়েছেন, কিন্তু অত খুটিয়ে খেয়াল করেননি। মিলিয়ে দেখে শেয়ার করতে পারেন আপনার অভিজ্ঞতা। আবার কইতেও পারেন, হ আর খায়া কাজ নাই! 😀

কলকাতা শহরটি প্রতিষ্ঠা করার সময় এর নদীপথটাকে মাথায় রেখেছিলো বৃটিশরা। তাই নদীর সাথে আড়াআড়ি উত্তর-দক্ষিনে লম্বালম্বী গড়ে ওঠে। ম্যাপ দেখলে বুঝতে পারবেন পরিস্কার। কোনো বিশেষজ্ঞের লেখা পড়ে নয়, বরং গুগল ম্যাপ দেখে ঘুরতে ঘুরতে এগুলো মাথায় এলো।

নদীর পাশে শহর তৈরী হলেও মোটামুটি সমান দুরত্ব ছিলো শহরের সাথে ভাগীরথি নদীর, হয়তো জোয়ার ভাটার জন্যে। আর এর সুযোগে সরকার নদীর আড়াআড়ি রেললাইন টেনে দেয়। মাঝখানে হয় রাজপথ। কয়েক যুগ পর হয় মেট্রো, সেই সমান্তরাল।

তাদের শহরের যোগাযোগের মেরুদন্ড প্রধানত দুই রকমের রেল। সড়ক ও নৌপথও সমান গুরুত্বপূর্ণ। লোকাল বাসে খুব বাদুরঝোলা ভীড় থাকে না। ভাড়া ৭ রুপি সর্বনিম্ন। টাটা ইলেকট্রিক বাস বের করেছে দেখলাম ও চড়লাম… দারুন! কিন্তু অনেক ভীড়।

মেট্রোতে নির্ভর করে বেশীর ভাগ শহরবাসী। মফস্বলবাসীর ভরসা লোকাল ট্রেন। কেউ কেউ ২০০ কিমির বেশী ট্রেন ভ্রমন করে অফিসে আসা যাওয়ার পথে।

আয়েশি ঢাকাবাসী কেন বললাম জানেন? আপনি ওখানে পায়ের ওপর পা দিয়ে রিকশায় বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে ঘরের গেটে নামতে পারবেন না। পারবেন না বৃস্টির সময় বাসার বারান্দার ছাউনি পর্যন্ত রিকশা ডেকে আনতে। বা অসুখ-বিসুখে দুইজন বসে রোগীকে পাঁজাকোলা করে করে হাঁক দিতে পারবেন না, “ওই চল ঢাকা মেডিকেল!” কারন তিন চাকার রিকশা ঢাকার মতো দাবড়ে বেড়ায় না।

সস্তায় ও সহজ কিস্তিতে তাদের দেশের গাড়ি ও বাইক মেলে। সমানে চালাচ্ছে পুরুষ মহিলা। নয়তো এগারো নম্বর অর্থাৎ পা-ই ভরসা। কলকাতাবাসী মানে হলো হাঁটার দম। খুচরা ঘোরাঘুরি বাজারসদাই হেঁটেই করতে হয় বেশির ভাগ মানুষের। অন্যসব ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা অবশ্যই আমাদের চেয়ে চমৎকার। মিছিল মিটিং হলে অনেক জ্যাম লাগে। কিন্তু ঢাকায় যেহেতু থাকেন, সহনীয় মনে হবে।

অনেক পুরোনো মুড়ির টিন বাস, কিন্তু ট্যাপা খাওয়া ভচকানো একটিও নেই। রঙ দিয়ে ঢাকার মতো লেখাজোঁকা, “আল্লাহ ভরসা” এর জায়গায় “জয় মা কালী” বা “জয় হনুমান”…

নেই ওভারটেকিং আর রেসিং। আড়াআড়ি করে মাঝরাস্তায় বাস রেখে যাত্রী তোলা ড্রাইভারদের কল্পনার বাইরে। ওদের ট্রেড ইউনিয়ন অনেক শক্তিশালী, কিন্তু সম্রাট শাজাহনের মতো মামুবাড়ির আব্দারের সাহস পায় না কোনোদিন। কঠোর প্রয়োগে ট্রাফিক রুল মানে সবাই। আইনভঙ্গের জরিমানাও অনেক।

আছে শতবর্ষী ট্রাম, সাথে চামড়ার ব্যাগ ঝোলানো কনট্রাকটর। অনেকটা এন্টিক হয়ে দয়ায় টিকে আছে সংক্ষেপিত রুটে…

বিদেশী দেখলে ট্যাক্সিওয়ালাদের চুনা লাগানোর প্রবনতা আছে অন্য দেশের মতোই। ট্যাক্সিচালক বেশীর ভাগ বিহার আর ঝাড়খান্ডের। গল্পের ভান্ডার তারা।

মেট্রোতে বড় গাট্টি বোচকা লাগেজ বহন ও ছবি তোলা নিষেধ। মেট্রো থামে ১৫ সেকেন্ডের জন্য। এর মাঝেই দৌড়ে ধুপধাপ ওঠানামা। ছেলেমেয়ে বুড়া জোয়ান কথা নেই। সিনিয়র সিটিজেনদের প্রতি বগিতে ৮/১০টা সিট রিজার্ভ।

গরমের মাঝে এয়ার কন্ডিশনে প্রশান্তির জার্নি। শো শো ঘরঘর শব্দ আর রোবটের মতো নির্লিপ্ত চেহারার ক্লান্ত মানুষদের সারি… কেউ পাঞ্জাবী, কেউ গুজরাটি, কেউ দেহাতি, কেউবা বাঙালী… নিরব বুড়োবুড়ি, ঝগড়াটে মাঝ বয়সী, মোটা চশমার সুদর্শন পড়ুয়া টাইপ তরুন বা মায়ময় টানা চোখের তরুনী…

চেহারা আর বেশভুষার কিছুটা পার্থক্য বলে দেয় অন্যরকম সংস্কৃতির ভিন্নগল্প। যা জানতে হলে যেতে হবে তাদের অন্দরে, তাদের পরিবেশে। ও হ্যাঁ, রাজনৈতিক গালগপ্পো কেউ করে না। একেবারে নিরব… ট্রেন থামলেই আবার সবাই দৌড় আর দৌড়। কারো দিকে তাকানোর ফুরসত নেই কারো।

লোকাল ট্রেনে মেয়েদের আলাদা বগি বেগুনী রঙ চিহ্নিত। ভুলে উঠলেও কপালে শনি আছে!

উত্তর কলকাতা হচ্ছে একেবারে আদি বাসিন্দাদের এলাকা, পুরনো। আর ময়দান, দ্যা বিগ এম্পটি! দক্ষিন এশিয়ার একটি দেশের একটা প্রদেশের রাজধানীর এত বিশাল মাঠ অবিকৃত রাখতে পারা অনেক বড় বিলাসিতা, বিস্ময়করও বটে! বলতে গেলে কলকাতার ফুসফুস এই সবুজ। একে ঘিরেই গড়ে উঠেছে শত বছরের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বলয়।

সাউথ কলকাতা অনেকটাই দেশভাগ ও একাত্তরের পর ঘটি-বাঙ্গালের নতুন বসতির মধ্যে দিয়ে তৈরী, কিছুটা উত্তরার মতো। ভারতের অন্যতম বৃহৎ সাউথ সিটি মল আর ১৮ শো পরিবারের বিশাল ৩৫ তলার ৪টা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স সাউথ সিটি এখানেই। বিখ্যাত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এর কাছাকাছি।

পূর্বে আছে নিও টাউন। নতুন আধুনিক শহর। পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ শহর রিয়াদে আমি যেহেতু থেকেছি কিছুদিন, এইসব আধুনিকতা গোণায় ধরার মতো মনে হয়নি আমার। তার ওপর আবার আমি প্রাচীনপ্রেমী, প্রাচীনপন্থী না কিন্তু!

সাউথের স্থানীয়, টালিগঞ্জের রাজাদা এর সাথে অনেক আড্ডা হলো দেশ-জাতি, মিডিয়া, ইধার উধার নিয়ে… হোটেলের রুমে, একেবারে মাঝরাত অব্দি। উনি কলকাতার ফিল্ম ও সিরিয়ালের ক্যামেরাম্যান। বাংলাদেশেও আসেন ক্ষ্যাপ মারতে। কলকাতায় জাতি ধর্ম নির্বিশেষে অনেক রাজা আর পুজা নামের মানুষ পাবেন। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের কমন নাম ফয়সাল আর ওমর, বাংলাদেশে বাবু, রিপন আর সুমন। এই নামের ভাইবোনেরা আবার মাইন্ড কইরেন না! 🙂

এরপর হয়তো লিখবো ঘুরতে আর চিকিৎসার জন্য গেলে কোথায় থাকবেন, কি খাবেন… আর বৃহত্তম রেল স্টেশন নিয়ে।

বিশাল লেখার জন্য ধৈর্যচ্যুতি ঘটে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা… মাইন্ড না করে পোস্টটা জাস্ট ইগনোর করে যাবেন প্লিজ… লিখেছি মাত্র, ক্যাসিনো আর বালিশে টাকা ওড়াইনি কিন্তু!

মাধ্যম
মাত্র ৫৭০ টাকা খরচে ঢাকা থেকে কলকাতা নিউমার্কেট হোটেল পর্যন্ত!মান্না দে-র কফি হাউজ ও ১৮ রুপির কাপ ধোয়া পানিচোর বাজার, চাঁদনী চক ও সস্তার মোবাইল বৃত্তান্তজাকারিয়া স্ট্রিটে সুফিয়ার পায়া নেহারি কাহিনীকলকাতার নাখোদা মসজিদ ও এক দেশীভাইহুগলীর তীরে, হাওড়া ব্রীজে
ট্যাগ

এমন আরও সংবাদ

Back to top button
Close
Close