প্রবাস ও অভিবাসনবিশেষ প্রতিবেদন

অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাবুল খানের হাহাকার দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেও দেশে নেই তার ঠিকানা

অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাবুল খানের হাহাকার কুড়িগ্রাম লাইভ ডেস্ক: অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের খান (বাবুল খান) তার অসহায় হয়ে ঘুরছেন ঢাকায়। ধর্ণা দিচ্ছেন, সরকারের নানা দপ্তরে। প্রতারণায় সর্বস্ব খুইয়েছেন তিনি। বিদেশ থেকে প্রায় ৩০ বছর পর দেশে ফিরে নিজের ভিটে মাটিতেও থাকতে পারছেন না তিনি। প্রবাসী কর্ম জীবনে জমানো বাবুল খানের প্রায় ৪ কোটি টাকা টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছে, লোভী স্বজনরা। দখল করেছে তার উত্তর রায়ের বাগের পৈত্রিক জমিটুকুও। এসব ফেরত চাইলে, মামলায় জড়ানো হয়েছে। হামলা হচ্ছে তার পরিবারের উপর। সবকিছু ছেড়ে চুপচাপ বিদেশে চলে না গেলে- মেরে ফেলারও হুমকি দেয়া হচ্ছে । আলাপকালে কাঁদতে কাঁদতে এসব অভিযোগই শোনাচ্ছিলেন বাবুল খান আর তার স্ত্রী আরজু মনোয়ারা বেগম।

মুক্তিযোদ্ধা বাবুল খান দেশে চাকরি করে সংসারে অভাব মেটাতে পারেননি। তাই দেশ ছেড়েছেন ১৯৮৮ সালে। ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে কাজ খুজেছেন অষ্ট্রেলিয়ায়। অনেক কঠিন সেখানে জীবনযুদ্ধ। তাই করেছেন, বছরের পর বছর। অবশেষে মিলেছে সেখানকার পাসপোর্ট। ভালো চাকরিও পেয়েছেন তিনি। সিডনির হার্বড বিচ হোটেলে প্রধান শেফ হিসেবে তার সুখ্যাতি আছে। অষ্ট্রেলিয়ানরা তাকে সন্মানের সাথে ডাকে ‘শেফ বাবু’ । বয়স বাড়ছে। খানিকটা অসুস্থও। তাই দেশে ফিরে পরিবার নিয়ে অবসর জীবন কাটানোর ইচ্ছে ।

babul khanগত বছর নভেম্বরে ঢাকায় ফিরলেন। এরপরই তার সব আশা একেবারে দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। বাবুল খানের পৈত্রিক ভিটে যাত্রাবাড়ির থানার উত্তর রায়েরবাগ ২ নম্বর সড়কে। এটি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বাইরের এলাকা। নিজের জমি আর টিনশেড বাড়ির সাথে সেখানে আছে বাবুল খানের কয়েকটি দোকানও । যা দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন বড় ভাই আব্দুর রহমান, ভাগ্নি জামাই মকবুল হোসেন ও ভাগ্নে জাহাঙ্গীর মিয়াকে। পৈত্রিক ওই জমিতে বাড়ি করা, দোকান নির্মাণ ও ব্যবসার জন্য অষ্ট্রেলিয়া থেকে তাদের নামে ১১ বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকাও পাঠিয়েছিলেন, বাবুল খান। এখন ঢাকায় এসে বাবুল খান দেখেন বিদেশ থেকে পাঠানো তার টাকায় তার বাড়ি-ঘর তৈরি হয়নি। উল্টো তার জমির একাংশ বেচে দিয়েছে মকবুল ও জাহাঙ্গীর।

আর বিদেশ থেকে পাঠানো বাবুল খানের টাকায় নিজেরা ট্রাক কিনেছেন, বাড়ি করেছেন, আলাদা ব্যবসা করছেন। এই ব্যবসা নিয়েও আছে নানা অভিযোগ। জাহাঙ্গীর মিয়া কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, মাদক ব্যবসার মামলায়। তার কাছ থেকে ইয়াবা-হেরোইনও উদ্ধার করেছে পুলিশ। এখনো জেলে তিনি। ঢাকায় আসার পর স্থানীয় পুলিশের কাছে অভিযোগ দিয়ে নিজের পৈত্রিক ভিটায় যেতে চেষ্টা করেছেন, বাবুল খান। প্রতিবারই তার উপর হামলা হয়েছে। বাবুল খানের স্ত্রী আরজু মনোয়ারাকে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। এর আগে, ২০১১ সালে দেশে একবার দেশে আসেন বাবুল খান। উত্তর রায়ের বাগের পৈত্রিক ভিটায় পরিবারের জন্য তোলেন ছাপড়া ঘর। সেবার অষ্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় জমি ভাগাভাগি করা হবে- এই অজুহাতে তার কাছ থেকে পাওয়ার অব এ্যটর্নী নেন ভাগ্নে জাহাঙ্গীর মিয়া ও ভাগ্নি জামাই মকবুল হোসেন। কাদের খান অষ্ট্রেলিয়া যাওয়র জন্য ঢাকা বিমান বন্দরে যাওয়ার সাথে সাথে মকবুল ও জাহাঙ্গীর ভেঙ্গে ফেলে তার ছাপড়া বাড়ি।

বাবুল খান দেখাচ্ছিলেন, পৈত্রিক জমিতে তার মালিকানার সব দলিল আর প্রমাণপত্র। বিদেশ থেকে যে টাকা পাঠিয়েছেন, তার সব কিছুর রশিদ। এসব পুলিশকেও দেখিয়েছেন তিনি। কিন্ত কোন সুরাহা হয়নি। তিনি বুঝে পাননি তার পৈত্রিক জমি। পাওনা টাকা। পুলিশ ওই জমিতে উচ্ছেদে গেলেই নানা বিপত্তি আর বাধা তৈরি করে, জাহাঙ্গীর আর মকবুলের পরিবার সদস্যরা। মুক্তিযোদ্ধা কাদের খানের নামে ধর্ষণ, ভাংচুর, অস্ত্র মামলা দেয়া হবে এমন হুমকিও দেয়। জমিতে গেলে এর আগে ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে বাবুল খানের উপর ৪ বার হামলাও চালানো হয়।
আপে করে বাবুল খান বলছিলেন, দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন দেশেই আমার কোন ঠিকানা নেই। নিজের ভিটায় যেতে পারিনা। পরিবার নিয়ে আমাকে হোটেলে হোটেলে রাত কাটাতে হয়। কখন কোথায় হামলা হবে এই ভয়ে রাস্তায় বের হতে পারিনা।
প্রবাসের চাকরি ছেড়ে ১১ মাস ধরে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন, মুক্তিযোদ্ধা বাবুল খান আর তার স্ত্রী আরজু মনোয়ারা। এতো দিন অনুপস্থিত থাকায় চলে গেছে চাকরি, বন্ধ হয়ে গেছে স্বাস্থ্যবীমা। বন্ধ তার আয় রোজগারের সব উপায়ও। এখন ঢাকায় ঘুরে ঘুরে পরিচিত কাউকে দেখলেই সাহায্য চাইছেন। বলছেন, বিপদ থেকে তাকে রা করতে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, পুলিশের আইজিসহ উর্ধতন অনেকের সাথেই দেখা করার চেষ্টা করেছেন, বাবুল খান। কিন্ত তার এই কষ্টের কথা কেউই শোনেনি। পাননি কোন সমাধান। এবার তার খুব চেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পর্যন্ত তার এই দুর্দশার কথা পৌছানো। সুযোগ পেলে দেখা করে, প্রধানমন্ত্রীর কাছেই এর বিচার চাইবেন। বলবেন, প্রবাসে থাকা হাজারো বাংলাদেশী প্রতিদিনই এমন নানা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, নিজের দেশেই ।

ট্যাগ

এমন আরও সংবাদ

এছাড়াও এই নিউজ টা পরতে পারেন

Close
Close
Close