ভ্রমণ

জীবন এখানে যেমন

আফজালুর রহমানআফজালুর রহমান, মালয়েশিয়া থেকে ফিরে: সেই প্রাইভেট কারওয়ালার কথা মনে পরে? আগের লেখায় বলেছিলাম শুনাবো তাঁর গল্প। শুধু তাঁর একার গল্প নয় আজ  থাকবে ভাগ্যের খোঁজে দেশ ছাড়া আরো এমন ক’জনের গল্প।কিছুটা রাখঢাক রেখেই শুনাবো এসব গল্প। চরিত্রগুলো সঠিক তবে নামগুলো সব আমার দেওয়া। কুয়ালালামপুর এমন এক শহর যেখানে হাঁটতে বের হলেই পথের কোথাও না কোথাও বাংলাদেশি নাগরিক আপনার চোখে পরবে।এই প্রতিটি মানুষের গল্প কিছুটা একই রকম। যার সার সংক্ষেপ মোটামুটি এরকম যে, তিনি শ্রমিক ভিসায় মালেয়শিয়া এসেছেন, ঠিক যেটা শুনে এসেছেন তার কিছুই পাননি এখানে। তারপর ভাগ্যকে ফেরাতে নিয়ম অনিয়মের চোখে বেঁধে দিয়েছেন কাল কাপড়। এখন চলছে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। আর সেই সংগ্রামে সবচেয়ে বড় আতংকের নাম “ভিসা মেয়াদ”।

অধিকাংশ শ্রমিকের ভিসা মেয়াদ শেষ। তবে তাঁরা দেশে ফিরতে রাজি নন।কিন্তু কেন? চকচকে তকতকে সুউচ্চ ভবনগুলো আশে পাশেই কোন একটি পরিত্যাক্ত প্রায় দালান খুঁজে দেখুন মালেয়শিয়ায়, সেখানেই পাবেন বাংলাদেশি শ্রমিক।রাত যখন গভীর সেখানে কান পাতুন, শুনতে পাবেন করুন বাংলা সুর। এই সুর আপনাকে কাঁদাবে নিশ্চিত।

ড্রাইভার আইযুব এদেশে এসেছেন নব্বয়ের দশকে। সে হিসেবে তাঁর প্রবাস জীবন দুই যুগেরও ঢের বেশি। আজও  দিন শেষে হুইস্কির পেয়ালায় দেশের স্মৃতি, কৈশরের দুরন্ত সময় আর এই যাচ্ছে চলে যাকনা জীবনের হিসাব মেলান তিনি। তবে তাঁর একটা সুবিধা আছে। তাঁকে এদেশের পুলিশ কখনই বিরক্ত করেনা। আইযুব বৈবাহিক সূত্রে এখন মালেয়শিয়ার নাগরিক। তাঁর একটা ছেলেও আছে সে ঘরে।সাথে আছে বউয়ের আগের ঘরের আরেকটি মেয়ে। তারপরও ভালই চলছিল। কী যেন কী হল একদিনের আচমকা ঝরে ভেঙ্গে গেল ১৭/১৮ বছরের সংসার।আইয়ুব কাজ থেকে সেদিনও যথা নিয়ম গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে ফিরেছেন ঘরে। তাই দেখেই শুরু বউয়ের খ্যাচখ্যাচানি।আর সহ্য হল না এদিন। যাচ্ছে তাই ভাবে পেটালো বউকে। বউ সেও কম না!ঘারে ধাক্কা দিয়ে বের করে করে দিল নেশাতুর পতি নারায়ন। দুঃখের ব্যাপার হল সে সময় পতি নারায়নের পড়নে কেবল একটি তোয়েলে। বহু অনুরোধেও সেদিন নিজের কাপড়টুকু পায়নি আইয়ুব। আগের ঘরের কণ্যা কিছুটা দয়া করে জানালা দিয়ে গাড়ির চাবিটা ছুরে দিয়েছিলো। সেদিন গামছা পড়ে গাড়ি চালাতে চালাতে এই মানুষটি একটি ঠিকানা খুঁজেছিল।ঠিকানাটা কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার নিভৃত একটি গ্রাম। যেখানে এমন একটিও ঘর নেই যে তাঁকে একটি রাতের আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানাবে।গল্পের পরের অংশটা গতানুগতিক।চাইলেও ফেরা যায় না ফেরা হয়ে ওঠে না। সেদিনের পর থেকেই জীবন চলে গাড়ির চাকার মত।এদেশে আইয়ুব আলীর সংসার আছে সন্তান আছে তবে সেখানে যাওয়ার অনুমতি নেই।নতুন করে ঘর অথবা সংসার আর হয়ে ওঠে নি।আর হবেই বা কিভাবে মেঘে মেঘে তো হয়েছে অনেক বেলা, বেড়ে গেছে বয়স। কখনো কখনো মনে সব ছেড়ে চলে আসবেন নিজের গ্রামে। জীবনের শেষ ক’টা দিন কাটাবেন এখানেই কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়। গ্রামে এখন সব বেদখল নিজের কিছুই নেই সেখানে। আইয়ুব আলীর একটি গোপন ইচ্ছা আছে। এই পৃথিবীতে তাঁর একটাই সন্তান। একবার হলেও এই সন্তানকে নিজের গ্রামটা দেখাতে চান তিনি। একথা বলতেই চোখের পানি মুছলেন।

মোঃ মোকাদ্দেছ হোসেন মালেশিয়ায় আছেন গত ৮ বছর ধরে।গত ৪ বছর কাজ করেছেন এখানকার কৃষি খামারে। সেটা ছিল পাম গাছের বাগান। এখানে কাজ করা তার খুবই অপছন্দের ছিল।একেবারে গ্রামাঞ্চলের এই বাগান মোটামুটি বড়সড় একটা জঙ্গলের মত। দৈনিক হাজিরা হিসেবে কাজ করতে হতো। দিনশেষে যে টাকা সে পেতো তার মধ্যেই নিজের খাওয়াদাওয়া এবং থাকার বন্দোবস্ত করতে হতো। থাকার ব্যবস্থা ছিল খুবই অনিরাপদ। এমন অনেক রাত গেছে ঘুম থেকে উঠে দেখে নিজের উপার্জনের সব টাকা চুরি হয়ে গেছে। তার উপর গভীর রাতে কিছু নেশাগ্রস্থ দূর্বৃত্ত এসে মার ধর করে সব নিয়ে যেতো। স্থানীয় পুলিশের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানানোও হয়েছে তবে খুব বেশি সমাধান পাওয়া যায়নি। তারপরও মেয়াদের সময়টুকু কাটিয়েছেন সেই পাম বাগানেই। ৪ বছর পর পাম বাগানের মালিক আর মেয়াদ বাড়ায়নি মোকাদ্দেছের।পরে সেখান থেকে কুয়ালালামপুরে এসে এক রেস্টুরেন্টে কাজ নেয় সে।এরই মধ্যে তাঁর পাসপোর্টে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।অনেক দালাল ধরেও কিছু হয়নি। গত ৩বছরের বেশি মালেয়শিয়ায় অবৈধ সে।সহায় সম্বল বিক্রি করে বিদেশে এসে নিজের ভাগ্য ফেরাতে পারেনি মোকাদ্দেছ।কি নিয়ে দেশে ফিরবেন? দেশে ফিরেই বা কি করবেন? এমন হাজারটা প্রশ্নে দেশে ফেরা হয়ে ওঠে না এই মোকাদ্দেছের মত আরও লক্ষ শ্রমিকের।

মোকাদ্দেছের গল্প এখানেই শেষ। তবে শেষ বললেই তো শেষ হয়ে যায় না। মালেয়শিয়ার অলিগলি ঘুরে এমন আরও কিছু গল্প আমি পেয়ে যাই। সবগুলো গল্প এখানে বলা সম্ভব নয়। এই গল্প গুলো সংগ্রহ করতে গিয়ে আমার কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে।বঙ্গ ভূমি থেকে ৪ হাজার কিলোমিটার দূরের এই দেশে এসেও পাওয়া গেল দেশীয় একটি অপরাধী চক্র। যাদের কাজ হল অসহায় এই প্রবাসী শ্রমিকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা।ভিসা সাপোর্ট দেওয়ার নামে এরা হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল পরিমানে অর্থ।প্রবাসে ভরসাহীন এক জীবনে অবৈধ হয়ে যাওয়া শ্রমিকরা শেষ আশ্রয় খুঁজে এই দালালদের কাছে।যখন বুঝতে পারে যে দালাল তাঁকে আসলে কিছুতেই সাহায্য করতে পারবে না ততদিনে আয় উপার্জনের সব শেষ। এখন তাহলে উপায়? আর কোন পথ খোলা নেই। এবার এই প্রতারিত শ্রমিক নিজেও শুরু করে নতুন প্রতারনার পরিকল্পনা এবং তাঁর স্বীকার হয় অন্য অসহায় অবৈধ হয়ে যাওয়া শ্রমিকরা। এভাবেই চলছে জীবন এখানে। এখানে এখন অবৈধ হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের প্রায় সবাই কমবেশি দালাল।এরা এক সময় ধরা পরে মালেয়শীয় পুলিশের হাতে।পরে তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হয় জেলে গিয়ে।

মোঃ জাহিদুল ইসলাম নামের আরেক জনের সাথে পরিচয় হল আমার। তিনি এদেশে “ম্যান পাওয়ার”(বিদেশে মানুষ পাঠানো)ব্যাবসার সাথে জড়িত। তার গাড়ির পেছনের সিটে বসেছি। যেতে যেতে এক সময় জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। “ মামা, আপনার গাড়ির সিটে দেখি কালো ওড়না পরে আছে।এটা কার?” “হাহাহা অট্ট হাসি। মামা, এইটা তোমার মামির। ওই গাড়িতে এইটা ঐটা ফেলে রাখে।সে ভাবে আমি অন্য মেয়েদের নিয়ে ঘুরে বেড়াই। ওড়না ফেলে যায় চুলের কাটা ফেলে যায় যাতে অন্য মেয়েরা গাড়িতে উঠলেই বুঝতে পাড়ে আমি বিবাহিত। হাহাহা”।মজার ব্যাপার তো! আমারও ভীষন হাসি পেল। নারী বিষয়ে আমার কৌতূহল ছিল আছে, তবে এই ঘটনা শুনার পর আগ্রহ আরও বাড়লো।পৃথিবীর সব নারী রং-বর্ণ অথবা আকার-প্রকৃতিতে আলাদা হলেও মনস্তাত্তিক বিশ্লেষনে আসলে একই রকম। জাহিদ সাহেবের স্ত্রী চীনের নাগরিক।

যাই হোক এই লোকের সাথে কথা হল দীর্ঘ্য সময়। তিনি গত প্রায় ৭ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে দেশীয় শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছেন। এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে বাংলাদেশীরা নিজেরাই মালেয়শিয়ায় নিজেদের ভাগ্য পুড়িয়েছে। এই দেশে আসা অধিকাংশ শ্রমিক কাজের প্রতি আন্তরিক নয়। অধিক উপার্জন করতে গিয়ে শেষে সব হারায়। সাংস্কৃতিক একটা কার্যকারনকেও টেনে আনলেন জনাব জাহিদ। তাঁর কথায়, “এই যে সহায় সম্বল শেষ করে মালেয়শিয়া আসে দেশের শ্রমিকরা।এসেই ভুলে যায় তাঁরা আসলে শ্রমিক। তারপর দিন শেষে টাকাটা কি করে জানেন? ঐযে চার রাস্তার মোড়ের কাছে ভেতরের দিকে রাস্তাটা দেখছেন সেখানে গিয়েই ফেলে আসে”। পথের ধারেই এই ধরনের টাকা উড়ানোর আস্তানার অভাব নেই কুয়ালালামপুর শহরে। এসব জায়গায় বাংলাদেশী শ্রমজীবী মানুষের অবাধ চলাচল। নেপালি একটি বারে বসে এই সব আলাপ করছি। এখানেও পরিবেশ কিছুটা ভীন্ন। অন্তত আমার মত একজন ,যিনি ধোঁয়া জাতীয় পদার্থ স্পর্শ করে না তার চোখে তো বটেই।

আরো আছে, মালেয়শিয়রা এক সময় বাংলাদেশীদের ভিষন পছন্দ করতো। সে সময় অধিকাংশ মালেয়শিয় নারীর পছন্দের তালিকায় বাংলাদেশী পুরুষরা জায়গা পেতো। তবে গত ৩ দশকে না হলেও এমন ১০ থেকে ১৫ হাজার নারী প্রতারিত হয়েছেন বাংলাদেশী পুরুষদের কাছে।বাংলাদেশী পুরুষ বিয়ে করে ফেলে গেছে তাঁদের। সন্তান নিয়ে তখন অবর্ননীয় যন্ত্রনায় দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের।নূন্যতম মানবিক মূল্যবোধ না দেখিয়ে কিছু মানুষ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গেছে আমার। জনাব জাহিদ যখন এসব কথা বলছিলেন আমার ভীষন কষ্ট হচ্ছিলো। তখন খুব ইচ্ছা করছিল, এমন নিষ্টুরতার স্বীকার একজন মায়ের কাছে গিয়ে বলি, চল বাংলাদেশ। তোমার হারিয়ে যাওয়া স্বামী একজন বাংলাদেশী। সুতরাং তুমি বাংলাদেশের বধু। আমরা তোমাকে বরণ করে নিবো।

কিন্তু সে সুযোগ নেই, হয়ে ওঠেনি।

শিক্ষিত মার্জিত বাংলাদেশিরা অভিবাসনের ঠিকানা খুঁজে ইউরোপ আমেরিকায়। সেসব দেশে বাংলাদেশের উজ্জ্বল একটি ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। যার বিপরিত চিত্র মালেয়শিয়ায়। বিদেশে শ্রমবাজার খুঁজে চলেছি আমরা। কিন্তু তাঁর বিপরিতে যোগ্য-দক্ষ এবং অবশ্যই মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শ্রম সম্পদ গড়ে তোলার কোন উদ্যোগ নেই। এতো অর্জন এতো উন্নয়ন সবই ভুল প্রমানিত হয়ে যায় শুধু এই মানবিক মূল্যবোধের অভাবে। সময় এসেছে এই ভুল গুলো শুধরে নেওয়ার।

ট্যাগ
Close
Close