ফুলবাড়ী

‘সব ভাসি গেইচে, একপালা মানুষ কি খায়া বাঁচমো’

ফুলবাড়ীফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা: ‘বানের পানিতে ধানও তলে গেইচে (গেছে), মাছও ভাসি (ভেসে) গেইচে। এক পালা (অনেক) মানুষ কি খায়া (খেয়ে) বাঁচমো বাহে-চিন্তা করি (করে) কুল পাই না’ এভাবেই আবেগের কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের ষাটোর্ধ কৃষক আমীর আলী।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই গ্রামের ঝাউকুটি এলাকায় নিজের তিন বিঘা জমিতে আমনের চারা লাগিয়েছেন আমীর আলী। সঠিক পরিচর্যার কারণে ক্ষেতের অবস্থাও ভাল ছিল। বাড়ির সামনের জলাশয়ে দশজন অংশীদার মিলে ত্রিশ বিঘা জমি বর্গা নিয়েছেন। জাল দিয়ে ঘিরে তৈরি করেছেন মাছ চাষের ঘের। ঘেরে ছেড়েছেন রুই, কাতল, মৃগেল, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির লক্ষাধিক টাকার পোনামাছ। আনন্দেই ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আনন্দ ম্লান করে হঠাৎ বন্যা এসে ভাসিয়ে নিয়ে মাছের ঘের আর আমনের জমিতে রেখে গেছে হাঁটু সমান বালু। তাই ভবিষ্যৎ ঝাপসা দেখছেন আমীর আলী। শুধু আমির আলীর নয়। ধরলা নদীর অববাহিকার এরকম প্রায় দুই শতাধিক ঘের, গোটা উপজেলার ছোট বড় দুই সহস্রাধিক পুকুর, জলাশয় ভেসে গেছে এবারের বন্যায়।

বড়ভিটা ইউনিয়নের নওদাবশ গ্রামের কৃষক হোসেন আলী, মুকুল চন্দ্র, পূর্ব ধনিরাম গ্রামের নুর ইসলাম জানান- যখন চারাগাছগুলো বাড়তে শুরু করেছে ঠিক সে সময়েই বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতি আরও বেশি হয়েছে। ছয় সাতদিন পানির নিচে থাকতেই পচে নষ্ট হয়ে গেছে কচি চারাগাছ। তারা আরও জানান, এসময় আবারও চারা লাগাতে পারলে ক্ষেত হতো। কিন্তু চারা না থাকায় তা আর সম্ভব নয়।

উপজেলা মৎস্য অফিসার মাহমুদুল হাসান জানান, এবারের বন্যায় উপজেলার দুই হাজার একশ’ মৎস্য চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যায় ভেসে যাওয়ার কারণে উপজেলার মৎস্য ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি ৭০ লাখ টাকা। যা সকল রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। অন্যদিকে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নে বানের পানিতে ডুবে এবং বালু জমে পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে প্রায় চার হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেত। কোন কোন জায়গায় স্রোতের তোড়ে চারা ছিঁড়ে উপড়ে ফাঁকা জমি পড়ে আছে। এমনিতেই বোরো মৌসুমে নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে কৃষকের অর্ধেক ধান চিটা হয়ে গেছে। বোরোর সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বন্যায় আমনের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ভবিষ্যতের পেটের ভাতের চিন্তায় হতাশ হয়ে পড়েছেন উপজেলার কৃষকেরা।

উপজেলা কৃষি অফিসার মাহাবুবুর রশিদ বলেন, এ বছর উপজেলায় নয় হাজার পাঁচশ’ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও প্রায় এগার হাজার দুইশ’ হেক্টর জমিতে আমন চারা রোপণ করেছে কৃষকরা। বন্যায় প্রায় চার হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেত পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। কৃষকরা যাতে পুনরায় আমন চারা লাগাতে পারে সে জন্য চারার ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।

সংবাদ উৎস
ইত্তেফাক
ট্যাগ
Close
Close